
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের নির্বাচনী মাঠে নাটকীয় মোড় নিয়েছে ভোটের রাজনীতি। বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু ও শ্রীনগর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মোমিন আলীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা এখন স্পষ্টভাবে জমজমাট হয়ে উঠেছে।
একদিকে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থী শেখ আব্দুল্লাহ, অন্যদিকে একই দলের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে পরিচিত বিদ্রোহী প্রার্থী সপু ও স্থানীয় প্রবীণ নেতৃত্ব মোমিন আলী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা এ কে এম ফখরুদ্দিন রাজী। সবমিলিয়ে মুন্সীগঞ্জ-১ এখন চতুরর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বীতার কেন্দ্রে।
এই আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজনই এখন ভোটের মাঠে প্রধান আলোচ্য বিষয়। দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির ১ নম্বর সদস্য শেখ আব্দুল্লাহ। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ রয়েছে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে তেমন সক্রিয় ছিলেন না এবং নির্বাচনী মাঠে তার গ্রহণযোগ্যতা সীমিত। তবে এসব স্রেফ বিরোধী পক্ষের অভিযোগ। এর বিপরীতে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হিসেবে আর্থিক ও সামাজিক সাংগঠনিক শক্তি ব্যাপক রয়েছে শেখ আব্দুল্লাহর।
অন্যদিকে, মীর সরফত আলী সপু দলীয়ভাবে মনোনয়ন না পেলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে এলাকায় ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক, কর্মীসমর্থনে মোটামুটি এগিয়ে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তবে আর্থিক দিকে তিনি অনেক পিছিয়ে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর তুলনায়। তার মনোনয়ন বৈধ হওয়ায় বিএনপির ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা এই আসনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য মোমিন আলীর ক্ষেত্রেও। যদিও প্রবীণ ও ত্যাগী নেতা হিসেবে তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত।
তবে এখনও অনিশ্চয়তা কাটেনি। শেষ পর্যন্ত মীর সরফত আলী সপু ও মোমিন আলী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন কি না তা নিয়েই চলছে নানা জল্পনা। কেন্দ্রীয় বিএনপির পক্ষ থেকে চাপ, সমঝোতা কিংবা শেষ মুহূর্তে ‘বিদ্রোহী প্রত্যাহার’- বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে এমন নজির নতুন নয়। ফলে ভোটারদের একাংশ এখনও অপেক্ষায় রয়েছেন শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তের দিকে।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী থাকায় সমীকরণ আরও জটিল হয়েছে। বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্ব যদি শেষ পর্যন্ত মীমাংসা না হয়, তাহলে জামায়াত এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘নীরব ভোট’ নিজেদের দিকে টানতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। বিশেষ করে শ্রীনগর ও সিরাজদিখানের কয়েকটি এলাকায় জামায়াতের অল্প হলেও সংগঠিত ভোটব্যাংক রয়েছে, যা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচন নিয়ে সবার আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। বিএনপির তিন প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি প্রচারণা, কর্মীদের মধ্যে বিভক্ত অবস্থান এবং সম্ভাব্য সমঝোতার গুঞ্জন- সবমিলিয়ে মাঠ বেশ উত্তপ্ত। অনেক ভোটারই এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক সমীকরণই তাদের ভোটের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সবমিলিয়ে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের লড়াই এখন পুরোপুরি খোলা। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে ভোট বিভক্ত হবে, বিদ্রোহীরা সরে দাঁড়ালে শেখ আব্দুল্লাহ সুবিধাজনক অবস্থানে যাবেন, আর বিভক্তির সুযোগে জামায়াত ‘ডার্ক হর্স’ হয়ে উঠতে পারে, যদিও সেই সম্ভাবনা একেবারেই কম। কারণ ঐতিহ্যগতভাবেই এই আসন বিএনপির ঘাঁটি।
এখন পর্যন্ত সব প্রার্থীরাই নিজের মতো করে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। শেখ আব্দুল্লাহ নির্বাচনী প্রচারণায় বলেন যে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং যুবকদের নেশামুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেছেন, নেশামুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে কাজ করা হবে যাতে তরুণ প্রজন্ম উন্নয়ন ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এই মন্তব্যে তিনি স্থানীয় উন্নয়ন ও সামাজিক সমস্যা সমাধানকে উল্লেখযোগ্য করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মীর সরফত আলী সপুকে সরাসরি নির্বাচনী ইস্যুতে কোনো বড় প্রকাশ্য বক্তব্য মিডিয়ায় দৃশ্যমানভাবে পাওয়া না গেলেও মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবিতে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে উপস্থিত থেকে তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে দলের জন্য যারা ত্যাগ শিকার করেছেন এবং যারা দীর্ঘ সময় আন্দোলনে ছিলেন, দল তাদের মূল্যায়ন করবে এবং মনোনয়ন দেবে। তিনি এমনই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তার সাথে সক্রিয় ছিলেন মোমিন আলী৷
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী এ কে এম ফখরুদ্দিন রাজীও নিজের মতো করে গণসংযোগ করেছেন। দলটির কর্মীদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে তিনি ভদ্র ও শিক্ষিত নেতা হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং এলাকার মানুষের অধিকার ও মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে ভোট চাইবেন।
শেখ আব্দুল্লাহ সামাজিক ইস্যু, শান্তি-শৃঙ্খলা ও যুবসমাজ উন্নয়নের প্রেক্ষাপট ধরে ভোটারদের কাছে বক্তব্য তুলে ধরছেন। মীর সরফত আলী সপু ও মোমিন আলী দলের অভ্যন্তরীণ সমর্থন ও দীর্ঘমেয়াদী ত্যাগকে নিজের নির্বাচনী প্রস্তাবনার কেন্দ্রে রাখছেন। মাওলানা এ. কে এম. ফখরুদ্দিন রাজী নিজে প্রকাশ্য ভাষণে গভীর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা না দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতার কথা দলের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত এই আসনের ফল নির্ভর করছে একটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর- মীর সরফত আলী সপু থাকছেন নাকি সরে দাঁড়াচ্ছেন? এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে মুন্সীগঞ্জ-১ এর ভোটের চূড়ান্ত ভাগ্য।